বাঙালির হাসির খোরাক সুকুমার রায়, ফিরে দেখা

সৌজন্যে- সত্যজিৎ চট্টোপাধ্যায়
    সুকুমার রায়ের জীবনে কবিগুরুর প্রভাব অনেকখানি। যখন রবীন্দ্রনাথ লন্ডনে গেলেন সুকুমার উচ্চশিক্ষার জন্য সেখানে, তার আবাসস্থল থেকে কবির বাসস্থান খুব কাছেই। এখানেই কবির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ক্রমশ অন্তরঙ্গতায় পরিণত হল। সুকুমার এই যোগাযোগের বিবরণ বিস্তারিতভাবে তাঁর মা-বাবা ও ঘনিষ্ঠদের চিঠি লিখে নিয়মিতভাবে জানাতেন। প্রায় দিনই কবির বাড়িতে নিমন্ত্রণ থাকত, এবং বলাবাহুল্য সেখানে অনেক বিদ্বান ব্যক্তিদের সঙ্গে চলত সাহিত্যের নানা আড্ডা। তিনি রবীন্দ্রনাথের অনেক গান/কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন— যা ইংল্যান্ডের গুণীমহলে সমাদৃত হয়েছিল। সেইসঙ্গে কবিও সন্তোষ লাভ করেছিলেন।

সুকুমার রায় উচ্চশিক্ষা থেকে ফিরে এসে রীতিমত শিশু সাহিত্য রচনার কাজে হাত দিলেন। পিতার মৃত্যুর পর ‘সন্দেশ’ পত্রিকার সমস্ত ভার তাঁর উপর এসে পড়ল। পত্রিকার যে মান পিতা সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন, তা বজায় রাখার জন্য সর্বতো প্রচেষ্টা চলল। সত্যিই আমৃত্যু তিনি ‘সন্দেশ’ পত্রিকার শ্রীবৃদ্ধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে গিয়েছিলেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র’র মন্তব্য অনুসারে— ‘তখনকার কয়েক বছরের ‘সন্দেশ’ পৃথিবীর যে কোনো ভাষার শিশু পত্রিকার সঙ্গে বুঝি পাল্লা দিতে পারত।’

ছোট্টবেলায় সুকুমার রায় কৌতুক আর দুষ্টুমিতে মেতে থাকতেন। তবে তাঁর এই আচরণ সীমা ছেড়ে যেতো না। বরং তা ছোট বড় সবাইকে আনন্দ দিতো, সুকুমার পড়তেন কলকাতার সিটি স্কুলে।

একবার এই স্কুলে এক নতুন শিক্ষক যোগদান করেছিলেন। কালোমতো শিক্ষকটি ছিলেন ভয়ানক কড়া প্রকৃতির। শিক্ষকটি ক্লাসে ঢুকলে ছাত্ররা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে যেতো। ব্যতিক্রম শুধু সুকুমার। একদিন শিক্ষকটি সাদা মোজা পরে ক্লাসে এলেন। কুচকুচে কালো পায়ে ধবধবে সাদা মোজা বেমানান ঠেকলো সুকুমারের দৃষ্টিতে। বালক সুকুমার তা দেখে কৌতুক করে বললো, মাস্টার মশাই দেখি আজ পায়ে চুনকাম করে এসেছেন। কথাটি শুনে গুরুগম্ভীর শিক্ষকটি ফিক করে হেসে উঠলেন।

সুকুমার রায় বাড়ির সদস্যদের নিয়েও আমোদ প্রমোদে মত্ত থাকতেন। নকল দাড়ি গোঁফ লাগিয়ে অভিনয় অভিনয় খেলতেন। একবার হয়েছে কি জানো, সুকুমার তাঁর বন্ধুকে চমকে দেয়ার জন্যে নকল দাড়ি গোঁফ লাগিয়ে সন্ন্যাসী ঠাকুর সেজে বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে হাজির। দরজার কড়া নাড়তেই বন্ধুর মা দরজা খুলে দিলেন। সুকুমার অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন।

বন্ধুর মা সন্ন্যাসীকে দেখে প্রণাম করে আশির্বাদ চাইলেন। অবস্থা বেসামাল। আশির্বাদ উচ্চারণ তো দূরের কথা, টু শব্দটিও না করে সুকুমার বাড়ির দিকে দিলো ছুট। বন্ধুর মা ব্যাপারটা দেখে যেনো আকাশ থেকে পড়লেন।
সুকুমার বাড়িতে একটি নাটকের দল গড়ে তুলেছিলেন। নাটক দলের নাম রাখলেন ‘ননসেন্স ক্লাব’।

শিশু সাহিত্য ও সুকুমার রায়
হেড আফিসের বড় বাবু লোকটি বড়ই শান্ত,
তার যে এমন মাথার ব্যামো কেউ কখনও জানত ?দিব্যি ছিলেন খোশমেজাজে চেয়ারখানি চেপে,একলা ব'সে ঝিমঝিমিয়ে হঠাৎ গেলেন ক্ষেপে !আঁৎকে উঠে হাত পা ছুঁড়ে চোখটি ক'রে গোল ....

শিশুদের জন্য এমনি অনেক মজার ছড়া লিখে গেছেন সুকুমার রায়। ‘গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, তাই দিয়ে যায় চেনা।’ এমন আজগুবি অথচ সার্থক রচনা ছিলো সুকুমার রায়ের।

‘আবোলতাবোল’ গ্রন্থের ভূমিকায় নিজেই লিখেছিলেন, ‘যাহা আজগুবি, যাহা উদ্ভট, যাহা অসম্ভব, তাহাদের লইয়াই এই পুস্তকের কারবার। ইহা খেয়াল রসের বই, সুতরাং সে রস যাঁহারা উপভোগ করিতে পারেন না, এ পুস্তক তাঁহাদের জন্য নহে।’

সুকুমার রায় (১৮৮৭ - ১৯২৩) একজন বাঙালি শিশুসাহিত্যিক ও বাংলা সাহিত্যে "ননসেন্স্ রাইমের" প্রবর্তক। তিনি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম শিশুসাহিত্যিকদের একজন। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বৈচিত্র্য সৃষ্টিকর্তা সুকুমার রায়। তিনি বহুমাত্রিক লেখক। কিন্তু তাঁর ছড়ার ছটা সবচেয়ে উজ্জ্বল।

আমার প্রফেট সুকুমার রায়। উনি না থাকলে, ওঁর লেখা না পড়লে একটি গানের একটি লাইনও লিখতে পারতাম না, ভাবতেই পারতাম না।

“তোর গানে পেঁচি রে/ সব ভুলে গেছি রে” – এমন প্রেমের উক্তি পৃথিবীর কোনও কবি করতে পারেননি। “চট্‌ করে মনে পড়ে মট্‌কার কাছে/ আধখানা মালপোয়া কাল থেকে আছে” – এমন ছুটন্ত, জীবন্ত, অনন্ত বাংলা এই জাতির কোনও কবি লিখতে পারেননি।

আমার গানের একটি লাইনও যদি কারুর ভালো লেগে থাকে তো তিনি জানবেন তার মূলে আছেন, থাকবেন সুকুমার রায়।

এমনকি আমার সুরেও আছেন তিনি। এটা আমি বোঝাতে পারব না। আমার সুর একটা আলাদা মেজাজ থেকে এসেছে, আসে। সেই মেজাজটা আমায় দিয়েছেন সুকুমার রায়। সেই কোন্‌ ছোট্টবেলা থেকে আমার ‘সুকুমার হয়ে আছে’, হয়ে ব’সে আছে।

 বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কারিগর ও কবি-নাট্যকার-গল্পকার তিনি। আমি নিতান্তই ভাগ্যবান তাই তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছি। আমি নিতান্তই ভাগ্যবান তাই “আমাকে ভাবায় সুকুমার রায়”-এর মতো গান বাঁধতে পেরেছি। আমি মনে করি এটা আমার শ্রেষ্ঠ গান। কেন বলছি তা বাঙালি জাতিকে বোঝানোর জন্য আর-একটা “কবীর সুমন” দরকার।

আর-একটা  কবীর সুমন থাকলে সে বলে যেত এই কবীর সুমনটা কী করে গেল। আর-একটা কবীর সুমন থাকলে সে হয়তো বোঝাতে পারত এই কবীর সুমনটা সুকুমার রায়কে কেন “প্রফেট” বলছে।

কবির সুমন যখন কারও সম্পর্কে বলেন যখন কিছু বলেন তখন বাংলাভাষায় আর কিছু বলার থাকে না ।অন্তত আমি তা মনে করি।

বাঙালির শৈশব , কৈশোর , যৌবন , বার্ধক্যে যার লেখা চেটেপুটে খায় তার নাম সুকুমার রায়।

 প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা

Post a Comment

0 Comments